দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতে দীর্ঘদিনের জনবলসংকট দূর করতে বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মোট ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াটি তিনটি ধাপে সম্পন্ন হবে, যার মধ্যে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই প্রথম ধাপে ৪৫ হাজার ৭০০ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে।
নিয়োগ পরিকল্পনার সংক্ষিপ্ত তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| মোট নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা | ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী |
| ধাপের সংখ্যা | ৩টি ধাপ |
| প্রথম ধাপে নিয়োগ (চলতি অর্থবছর) | ৪৫,৭০০ জন |
| চিকিৎসক নিয়োগ | বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ৫,০০০ জন |
| দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর | স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ |
কেন এই বৃহৎ নিয়োগ উদ্যোগ?
দেশের মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে তীব্র জনবলসংকটে ভুগছে। বর্তমানে অনুমোদিত ৬৫ হাজার ২৩০টি মাঠপর্যায়ের পদের মধ্যে প্রায় ১৮ হাজার ৯৪৭টি পদই খালি রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘স্বাস্থ্য সহকারী’ পদে প্রায় ৬,৯৫৩টি এবং ‘পরিবারকল্যাণ সহকারী’ পদে প্রায় ৮,২৯৩টি পদ শূন্য। কিছু এলাকায় সংকট আরও প্রকট—যেমন লালমনিরহাটে চিকিৎসকদের অর্ধেক পদই খালি, আর ঢাকার সিএমএসডিতে মোট ২৩০টি পদের মধ্যে ১৬০টিই ফাঁকা। এই জনবলসংকটের কারণে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতির নির্দেশনা
প্রথম ধাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডের শূন্য পদে জরুরি ভিত্তিতে সরাসরি নিয়োগ ও পদোন্নতির নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমীর স্বাক্ষরিত একটি চিঠির মাধ্যমে এই নির্দেশনা জারি করা হয়। জানানো হয়েছে, ২০১৮ সালের নন-মেডিক্যাল কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা অনুসরণ করেই দ্রুত এসব পদে জনবল নেওয়া হবে।
এছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠানে আগে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও মামলা বা প্রশাসনিক জটিলতায় নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা যায়নি, সেসব পদের ছাড়পত্র নিয়ে পুনরায় সমন্বিত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে, যাতে বিদ্যমান জটিলতাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হয়।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ
স্বাস্থ্য গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এত বড় পরিসরের নিয়োগে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদের অভিমত, স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দিয়ে নতুন কর্মী নিয়োগের বদলে দেশে ইতিমধ্যে বেকার থাকা প্রায় ৪০ হাজার নার্স, ৮ হাজার মিডওয়াইফ এবং ডিপ্লোমাধারী হেলথ টেকনোলজিস্টদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলে সেবার মান বাড়ার পাশাপাশি সরকারের ব্যয়ও সাশ্রয় হতে পারে।
বাজেট ও নারী কর্মীদের অগ্রাধিকার
চলতি বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে রেকর্ড পরিমাণ ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সরকার এই নিয়োগের ৮০ শতাংশ পদে নারী কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চাকরিপ্রার্থীদের উদ্বেগ: দীর্ঘসূত্রতার শঙ্কা
ইতিবাচক পরিকল্পনা সত্ত্বেও অনেক চাকরিপ্রার্থী সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার চিরচেনা আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি নিয়ে শঙ্কিত। তাঁদের মতে, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে প্রকৃত পদায়ন পর্যন্ত পৌঁছাতে সরকারি নিয়োগে সাধারণত বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। তাই এত বড় নিয়োগ কার্যক্রমে মামলা বা প্রশাসনিক জটিলতায় দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে সরকারের কঠোর নজরদারি রাখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা, যাতে জরুরি চিকিৎসাসেবার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন হয়।
সংক্ষেপে মূল বিষয়সমূহ
- মোট ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা, তিনটি ধাপে বাস্তবায়িত হবে
- চলতি অর্থবছরে (২০২৬-২৭) প্রথম ধাপে ৪৫,৭০০ জন নিয়োগ পাবেন
- বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে আলাদাভাবে ৫,০০০ চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে
- ১৩-১৬তম গ্রেডের শূন্য পদে জরুরি ভিত্তিতে সরাসরি নিয়োগ ও পদোন্নতির নির্দেশনা জারি
- নিয়োগের ৮০ শতাংশ পদে নারী কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে
- বিশেষজ্ঞরা বেকার নার্স, মিডওয়াইফ ও হেলথ টেকনোলজিস্টদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. মোট কতজন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে? সরকার তিন ধাপে মোট ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে।
২. চলতি অর্থবছরে কতজন নিয়োগ পাবেন? ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রথম ধাপে ৪৫ হাজার ৭০০ জন নিয়োগ পাবেন।
৩. চিকিৎসক নিয়োগ কীভাবে হবে? বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ৫,০০০ চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে।
৪. এই নিয়োগে নারীদের জন্য কোনো সংরক্ষণ আছে কি? হ্যাঁ, মোট পদের ৮০ শতাংশে নারী কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
৫. কোন নিয়োগবিধি অনুসরণ করা হচ্ছে? ১৩-১৬তম গ্রেডের পদে ২০১৮ সালের নন-মেডিক্যাল কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো। বিস্তারিত ও হালনাগাদ তথ্যের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের অফিশিয়াল ঘোষণা অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, কেননা এখনো এটি নির্দিষ্ট পদ বা আবেদন সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞপ্তি নয়, বরং সরকারের সামগ্রিক নিয়োগ পরিকল্পনা সম্পর্কিত প্রতিবেদন।

